নির্যাতন কী? নারী নির্যাতন সম্পর্কে আলোচনা কর।

নির্যাতন বলতে কী বুঝায়? নারী নির্যাতনের বিভিন্ন দিক আলোচনা কর।
অথবা, নির্যাতন কাকে বলে? নারী নির্যাতন সম্পর্কে বর্ণনা দাও।
অথবা, নির্যাতন কী? নারী নির্যাতনের বিভিন্ন দিক তুলে ধর।
অথবা, নির্যাতন বলতে কী বুঝ? নারী নির্যাতনের বিভিন্ন দিক বর্ণনা কর।
অথবা, নির্যাতনের সংজ্ঞা দাও। নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দাও।
উত্তর৷ ভূমিকা :
ইংরেজিতে Oppression এবং Violence দু’টি শব্দ আছে। শব্দ দু’টি বুঝাতে বাংলায় নির্যাতন শব্দটি ব্যবহৃত হয়। নির্যাতনে দু’টি পক্ষ থাকে। একজন নির্যাতন করে, অপরজন নির্যাতন ভোগ করে। নির্যাতন দৈহিক হতে পারে, মানসিকও হতে পারে। নারীসমাজের উপর অত্যাচার নিপীড়ন বিভিন্ন পন্থায় হয়ে থাকে।
নির্যাতন: কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির উপর যখন দৈহিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে নির্যাতন বলে। কাউকে দৈহিক কষ্ট দেয়া, কাউকে প্রহার করা, কিংবা কাউকে মানসিক যন্ত্রণা দেয়া, কাউকে পদে পদে খোটা দেয়া উভয়ই নির্যাতন। এক কথায় নির্যাতন অর্থ দৈহিক ও মানসিক লাঞ্ছনা। এ প্রসঙ্গে Hacker তাঁর ‘Crusaders
Criminals and Crazis’ (P-102) গ্রন্থে বলেছেন, “To brighten, and by brightening to dominate an control.” নির্যাতন বলতে বুঝায়, ভীতি প্রদর্শন ও ভীতি প্রদর্শনের দ্বারা আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। নির্যাতন কেবলমাত্র মারধর বা খোটাদানে সীমাবদ্ধ নয়, নির্যাতনের পরিধি বহু ব্যাপক।
নারী নির্যাতনের ব্যাপক রূপ : নারী নির্যাতনের ব্যাপক রূপগুলো থেকে দৃষ্টি নির্যাতনের সংকীর্ণ রূপের দিকে ফিরিয়ে রেখে কিছু কল্যাণকর কর্মকাণ্ডের দ্বারা নারী প্রগতি সাধনের উদ্যোগ নেয়া হয়ে থাকে। নিম্নে নারী নির্যাতনের ব্যাপক রূপ সম্পর্কে আলোচনা করা হল :
১.নারী নিজের জন্য কাজ করে না : নারী নিজের জন্য কাজ করে না, সে কাজ করে স্বামী, সন্তান ও পরিবার পরিজনের জন্য। আদর্শ নারী হচ্ছে পতিপ্রাণা। সে স্বামী ও সন্তানের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেবে। পরিবারের জন্য আত্মবিসর্জন, আত্মত্যাগ আদর্শ নারীর বৈশিষ্ট্য। নারী পরিশ্রম করবে, ফলভোগ করবে, স্বামী, সন্তান, পরিবার পরিজন। নিজের জন্য নারী কিছু করবে না, করার অধিকার তার নেই। সংসারের সেবায় নিবেদিতপ্রাণ নারী স্বামী সন্তানের পরিচর্যায় নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিবে।
২. অর্থনৈতিক মূল্য না থাকা : গৃহের চার দেওয়ালের মধ্যে নারী উদয়াস্ত কঠোর পরিশ্রম করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারীর দৈহিক মেহনতের পরিমাণ পুরুষ অপেক্ষা অনেক বেশি। তবু নারীকে নিষ্কর্মা, পরগাছা মনে করা হয়। কারণ নারীর কর্মের কোন অর্থনৈতিক মূল্যও দেয়া হয় না। তাকে সর্বতোভাবে পুরুষের উপর নির্ভরশীল মনে করা হয় এবং তার পৃথক অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় না।
৩. নারীর নিজের পরিচয় নেই : নারীর নিজের পরিচয় নেই, স্বামী বা সন্তানের নামে তার পরিচয়। পুরুষের অধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ নারীকে পরিবার, ঘরসংসার, আত্মীয়স্বজন বা বাইরের জগৎ, বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ডের কোন ব্যাপারে নীতিনির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা কর্মসম্পাদনের স্বাধীনতা দেয়া হয় না। নারীদেহ নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পুরুষের, এটাই হল পিতৃতন্ত্রের ভিত্তি ।
৪. নির্যাতন ভীতি প্রদর্শন : নারীর গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং নারীর স্বাস্থ্যসেবা দেহের উপর কারও কোন অধিকার নেই- এ বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার প্রয়োজনে পিতৃতন্ত্র নারী নির্যাতন তথা, নির্যাতনের ভীতি প্রদর্শনের আশ্রয় নেয়।
নারী নির্যাতন প্রক্রিয়া : নারী নির্যাতন প্রক্রিয়ার সাথে সার্বিক নির্যাতন প্রক্রিয়ার মিল আছে। নিম্নে নারী নির্যাতনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হল :১. মতাদর্শ : পুরুষ প্রাধান্য নারী নির্যাতনের আদর্শিক ভিত্তি। অবিবেচক, হঠকারি, বিচারবুদ্ধি বিবর্জিত, ভাবাবেগ রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নারীকে বশে রাখতে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে যদি নির্যাতনের প্রয়োজন পড়ে তবে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে, সমাজের সার্বিক কল্যাণের প্রয়োজনে নির্যাতন অপরিহার্য।
২. প্রচারণা : নারী নির্যাতনের মতাদর্শ সমাজে গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে ধর্ম, শিক্ষা ও পরিবারে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, রেডিও, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, নভেল— এমনকি বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে নারীর হীনতা ও অধীনতা এবং পুরুষের আধিপত্য নানাভাবে প্রচার করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
৩. বাছবিচারহীন ও অনৈতিকতা : বয়স, স্থান, কাল নির্বিশেষে সকল নারী বস্তুত নির্যাতনের সম্ভাব্য লক্ষ্য। নাবালিকা শিশু কন্যাকে শৈশবে নির্যাতনের শিকার হতে হয় খাদ্য ও চিকিৎসায় বৈষম্যের মাধ্যমে। চীনে কোমলমতি বালিকা পা ছোট রাখার জন্য লোহার জুতা পরানো হয়। পুরুষ প্রধান সমাজ নারী নির্যাতনে যে খারাপ কিছু আছে তা মনে করে না।
নারী নির্যাতনের বিশেষত্ব : নারী নির্যাতনের কতিপয় বিশেষত্ব আছে যা বর্ণনা করলে নারী নির্যাতনের স্বরূপ বোঝা যায়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল :
১. নারী নির্যাতনের সর্বজনীনতা : নারী নির্যাতন সর্বজনীন কোন আর্থসামাজিক ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়।
কে নারীকে নির্যাতন করে? জবাবে বলা যায় পুরুষ। বয়স, ধর্ম, বর্ণ, নরগোষ্ঠী নির্বিশেষে পুরুষ। সকল সম্প্রদায় উচ্চ, মধ্য, নিম্নবিত্ত, ধনী, নির্ধন, শিক্ষার সকল স্তরের পুরুষ নারী নির্যাতন করে তারা বিবাহিত, অবিবাহিত, তালাকপ্রাপ্তা, পরিত্যক্তা।
২. গোপন রাখার প্রবণতা : নারী নির্যাতনের ঘটনা সাধারণত গোপন করা হয়, জনসমক্ষে প্রচার হতে দেয়া হয় না। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা ন্যূনতম। পিতৃতন্ত্রের ঐতিহ্যে লালিত নারী নির্যাতনকে জীবনের বাস্তবতা মনে করে, প্রতিবাদ না করে ঢেকে রাখে। সাম্প্রতিককালে নারী আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে কিছু কিছু ঘটনা প্রকাশ হতে শুরু হয়েছে।
৩. সামাজিকীকরণ : সামাজিকীকরণ একটি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি তার সংস্কৃতি কর্তৃক সমুচিত বলে পরিগণিত, নিয়মকানুন, ভূমিকা ও সম্পর্কসমূহ শিক্ষা করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি সমাজের চিন্তাধারা ও আচরণ নিজের বলে গ্রহণ করে এবং নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নেয়।
৪. শাস্তিহীনতা : নারী নির্যাতনের মামলায় শাস্তির ঘটনা বিরল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারী পুরুষ বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। সামাজিক পরিবেশ সচরাচর নারী নির্যাতনকে ঘরোয়া ব্যাপার ‘গণ্য করে। স্ত্রীকে প্রহার বা তার সাথে দুর্ব্যবহার, অফিসে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, এসব ঘটনাকে সমাজ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আমল দিতে চায় না। কর্মস্থল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির সাথে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও ছাত্রজীবন জড়িত বিধায় কোর্ট কাচারিতে ন গিয়ে মিটিয়ে ফেলা হয়।
মূল্যায়ন : নারীকে পুরুষের অধীনতা পাশে আবদ্ধ রেখে নারীর উপর পুরুষের সর্বময় প্রভুত্ব বজায় রাখার জন্য পিতৃতন্ত্রের অস্ত্র নারী নির্যাতন। একে মূল্যায়ন করা যায় এভাবে, প্রথমত, আমাদের সমাজে প্রতিটি নারী সদাসর্বদা নির্যাতনের আতংকে ভোগে। এমনকি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, মার্কিন নারীরা নির্যাতনের ভয় থেকে মুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীকে হীন জ্ঞান করা হয়। এ প্রসঙ্গে Elizabeth Cady Stanton তাঁর ‘The
Woman’s Bible’ (P-66) গ্রন্থে বলেছেন, “Violence and its corollary bear serve to terrize females and
to maintain the patriarchal definition of women’s place.” অর্থাৎ, নির্যাতন ও তার আনুষঙ্গিক ভীতির দ্বারা নারীকে আতঙ্কিত করে রাখা হয় এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অধস্তন অবস্থানকে সুদৃঢ় করা হয়। তৃতীয়ত, স্ত্রীকে প্রহার মানবতা বিরোধী এমন অপরাধবোধ স্বামীর কদাচিৎ থাকে। এমনকি ধর্ষণের ক্ষেত্রে ধর্ষককে নিরপরাধী এবং নারীকে প্রকৃত অপরাধী সাব্যস্ত করার উদাহরণ বিরল নয়।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার শেষে বলা যায় যে, নারী নির্যাতনের উল্লিখিত প্রক্রিয়াগুলো বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নারী নির্যাতনের সংকীর্ণ রূপের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রেখে কিছু কল্যাণকর কর্মকাণ্ডের দ্বারা নারী প্রগতি সাধনের উদ্যোগ নেয়া হয়ে থাকে । কিন্তু ব্যাপক অর্থে নির্যাতনের রূপগুলোর মূলোৎপাটন না করলে নারীমুক্তি আসবে না।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!