Answer

নারী নির্যাতন বলতে কি বুঝ? নারী নির্যাতনের প্রকারভেদ আলোচনা কর। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণসমূহ বর্ণনা কর।

নারী নির্যাতন কী? বিভিন্ন প্রকারের নারী নির্যাতন ও বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা কর।
অথবা, নারী নির্যাতন কাকে বলে? নারী নির্যাতনে প্রকারভেদ ও বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে বিবরণ দাও।
অথবা, নারী নির্যাতনের সংজ্ঞা দাও। নারী নির্যাতনের প্রকারভেদসহ বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণসমূহ আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের একটি বিশেষ রিপোর্টে বলা হয়, “সমাজ ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে তার দু’বাহু হল নারী ও পুরুষ। একটিকে বাদ দিলে সমাজকাঠামোর দৈন্যদশা কখনও ঘুচবে না। একথা মনে রাখতে হবে যে, নারী মানবসম্পদের বিশ্ব উন্নয়নের দীর্ঘদিনের দাবিদার। তার অধিকার বার বার অস্বীকার করা হয়েছে বলেই পৃথিবীতে এত হানাহানি চলছে।” [৮ মার্চ, ২০০২ পৃষ্ঠা- ১২] অথচ সমাজে নারীকে দেখা হয় অবহেলার চোখে, দেয়া হয় না তাদের যথার্থ সম্মান। নীতিগতভাবে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বিশ্বব্যাপী নারী নিপীড়নের ঘটনা নতুন নয়। সভ্যতার অগ্রযাত্রার বিপরীতে মানবতাবিরোধী এরূপ বর্বরতা তাই নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই লজ্জাজনক। আফ্রো, এশীয় এমনকি ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোতেও নারীরা বিভিন্ন লাঞ্ছনার শিকার হয়ে থাকে প্রায়শই। বোধগম্য কারণেই স্বল্পোন্নত বিশ্বে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে নারীসমাজের অবস্থান তুলনামূলকভাবে আরও বেশি খারাপ ।
নারী নির্যাতন : Oxford English Dictionary তে বলা হয়েছে, Violence শব্দটি ল্যাটিন শব্দ, যা Vialatia থেকে এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ শক্তি প্রয়োগ, উৎপীড়ন, আক্রমণ ইত্যাদি।” নারী নির্যাতন বলতে শুধু নারীকে দৈহিক উৎপীড়ন নয়, বরং যে কোন ধরনের শোষণ করাকে বুঝায়।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সামাজিক সংস্থা নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাদের কয়েকটি সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলো : জাতিসংঘ ঘোষণা ১৯৯৩ এর Article-(1), অনুযায়ী নারী নির্যাতন হল- “Violence against women includes any act of gender base violence that results in or in likely to result in, physical, sexual or
psychological harm or suffering to women including threats such as coercion or arbitrary deprivation of liberty weather in public or private life. Hacker এর মতে, নির্যাতন বলতে বুঝায়, “To frighten and by frightening, to dominate and control.” [Ferederick F. Hacker, Crusaders Criminals and Crazis, Terrorism in our time] বাংলাদেশের নারীবাদী জরিনা রহমান খান বলেছেন, “নারী নির্যাতন বলতে শুধু নারীকে দৈহিক নির্যাতন নয়, বরং যে কোন ধরনের শোষণ করাকে বুঝায়।” যাহোক এককথায় বলা যায়, নারীর প্রতি সহিংসতা বলতে সেসব প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য ঘটনাকে বুঝায়, যেস সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের ফল ।
Analysis of Violence : Violence শব্দটিকে আমরা নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারি ঃ
V= Violence of human rights (vulgarity)
I = In human, Indecent.
e O = Obsession of Noxious..
L= Lack of legal literacy, Education and development.
E = Economic deprivation, Lack of employment and Empowerment.
N=Negation socio-economic evaluation of women and Negative attitude towards women.
C = Cultural Norms.
E = Unbalanced Empowerment.
নারী নির্যাতনের প্রকারভেদ : নীতিগতভাবে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদায় অধিকারী হয়েও নারীরা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। একপক্ষ শাসন নীতির ফলে নারীরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। নিম্নে বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন সম্পর্কে আলোচনা করা হল :
১. শারীরিক নির্যাতন : বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট ও সহজে শনাক্তযোগ্য নির্যাতন হচ্ছে শারীরিক নির্যাতন। প্রকৃতপক্ষে অনেকেই নারী নির্যাতন বলতে শারীরিক নির্যাতনকেই বুঝে থাকে। শারীরিক নির্যাতন বলতে বুঝায় নারীর প্রতি যে কোন ধরনের দৈহিক আক্রমণাত্মক আচরণ। যেমন-
ধাক্কা মারা, ঘুষি মারা, চিমটি কাটা, চড় মারা, কামড় দেয়া, চুল ধরে টানা, ছুরিকাঘাত করা, অগ্নিদগ্ধ করা, গরম পানি ঢালা, এসি নিক্ষেপ করা ইত্যাদি।
২. যৌন নির্যাতন : নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতনের মধ্যে পড়ে স্তন, যোনি প্রভৃতি কামোত্তেজনা সংবেদনশীল অঙ্গ আক্রমণ, ধর্ষণ বা জোরপূর্বক যৌনকর্ম হচ্ছে যৌন নির্যাতনের চূড়ান্ত রূপ। অনেক সময় ধর্ষণের পর হত্যা করার মত ঘটনা ঘটে থাকে।
৩. মানসিক নির্যাতন : মনস্তাত্ত্বিকভাবেও নারীরা নির্যাতিত হয়ে থাকে। যেমন- নারীকে বা তার প্রিয়ভাজন অন্য কাউকে মৌখিক হুমকি প্রদান, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ। আহার নিদ্রার মত নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্মে
বাধা প্রদান, সামাজিক সম্পর্কে বাধা দান, মৌখিক অপমান ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারী মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়ে থাকে।
৪. যৌতুক সম্পর্কিত নির্যাতন : নারী নির্যাতনের আরেকটি রূপ হল যৌতুক সম্পর্কিত নির্যাতন। যেমন- কোন নারীকে বিয়ের পর যৌতুক লাভের জন্য স্বামী বা তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা মানসিক বা শারীরিকভাবে নির্যাতন হল যৌতুক সম্পর্কিত নির্যাতন নারী নির্যাতনের এ ধরনগুলো একজন নারীর ঘরোয়া জীবন ও পারিবারিক আওতায় বা এলাকায় সংঘটিত হয়। এর পিছনে থাকে উক্ত নারীর পারিবারিক সদস্য কিংবা বাইরের তৃতীয় ব্যক্তি।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ : পৃথিবীতে নারী ও পুরুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অসম। আর অবস্থানগত অসমতার কারণেই নারী-পুরুষেরা নানা সহিংস আচরণের শিকার। নারী নির্যাতন বাংলাদেশে বহুল আলোচিত সামাজিক সমস্যা। বিগত দু’দশকে বাংলাদেশের নারী নির্যাতন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিম্নে বাংলাদেশের নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ উল্লেখ করা হলো :
১. ঐতিহাসিক কারণ : ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের সমাজ কোনকালেই শান্ত ও শান্তিপ্রিয় ছিল না। রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান পেশিশক্তির ব্যবহার ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অবাধ প্রবাহ এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি থেকে নারীরাও রেহাই পায়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হাজার হাজার মহিলা ধর্ষিত ও নির্যাতিত
হয়েছে। গত দু’দশক ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শিকার নারীরাও
হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ- আগ্নেয়াস্ত্র, এসিড ও অন্যান্য আত্মঘাতী অস্ত্রশস্ত্রের সহজলভ্যতা। টেলিভিশন, সিনেমা, থিয়েটার ও পত্র পত্রিকায় বিদেশি মডেল ব্যাপক সহিংসতার প্রচার। যুব সমাজের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও হতাশা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক আশ্রয় ও সমর্থন লাভ। আইন প্রণয়নকারী সংস্থার প্রশাসনিক দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতিপ্রবণতা। অশ্লীল ছায়াছবি, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, মুক্ত বাজার অর্থনীতির বিস্তার। নারীদের আইনগত সেবা প্রাপ্তির অপর্যাপ্ততা।
সর্বোপরি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অভাব। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহিংসতা ও দুর্নীতির অনুপ্রবেশ নারীর অবস্থানকে আরও অধস্তন করে দিয়েছে এবং তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
২. সকল সামাজিক কাঠামোতে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রয়োগ ও ধর্মীয় প্রভাব : স্থান, কাল, সমাজ নির্বিশেষে যেখানেই পুরুষতান্ত্রিক আদর্শ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি প্রাধান্যশীল অবস্থানে, সেখানেই নারী অধস্তন ও নির্যাতিত। তাই নারী অধস্তন হলে রাষ্ট্রীয় আইনেও তা স্পষ্ট হয়ে উঠে, সে সাথে সাময়িক বাস্তবতার স্বীকৃতি, শ্রেণি, বর্ণ, জাতি যে হোক না আমরা দেখি যে, নারী নির্যাতন শুধু উন্নয়নশীল দেশসমূহেই নয়, বরং উন্নত দেশেও অত্যন্ত প্রকট। মূলত সামাজিকভাব নিশ্চিতভাবে প্রতিনিধিত্বশীল গোষ্ঠীর মুখ্যতা আমাদের দেশে বিরাজমান। ধর্মীয় আইন সর্বদাই পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোগত ধ্যানধারণা ও মূল্যবোধের সহায়ক ভূমিকা পালন করে নারী নির্যাতনকে অনেকটা বৈধতা প্রদান করেছে। এ সময়ে প্রতিক্রিয়াশীল প্রাচীনপন্থি বিধিবিধান আবার সমাজপতি এবং তথাকথিত ফতোয়াবাজ মৌলবি মোল্লাদের হাতে পড়ে সমাজে নারী নির্যাতনের গুণগত ও পরিমাণগত মান বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীকে গৃহমুখীকরণ, তাদের অবাধ চলাফেরায় বাধ লিঙ্গগত শ্রম বিভাজন, সতীত্ব ও পবিত্রতার ধারণা, পারিবারিক মর্যাদা, সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, প্রথা, মূল্যবোধ, প্রতীক ও সাংস্কৃতিক গোঁড়ামি আরোপণে প্রকৃতির মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক সমাজের বনিয়াদি ও কর্তৃত্বশীল পুরুষ শ্রেণি নারী নির্যাতনকে সামাজিকভাবে বৈধ করে তুলেছে।
৩. আর্থসামাজিক কারণ : আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব প্রভৃতি আর্থসামাজিক কারণে নারী নির্যাতন টিকে আছে এবং ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলছে। ধর্ষণ, অপহরণ, নারী পাচার, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা এবং যৌতুক প্রথা প্রভৃতি নারী নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ড মূলত প্রচলিত আর্থসামাজিক অবস্থানই অনিবার্য পরিণতি ।
৪. নারী প্রসঙ্গে আইন ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি : তত্ত্বগতভাবে বাংলাদেশে নারী ও পুরুষ সমান সাংবিধানিক ও আইনগত মর্যাদার অধিকারী। সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ নারী বৈষম্য বিলুপ্ত সংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদেও অন্যতম স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। কিন্তু তত্ত্ব ও বাস্তবের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। মূলত সামাজিকভাবে যে নারী অধস্তন সেটা রাষ্ট্রীয় আইনেও স্পষ্ট হয়ে উঠে। ধর্মীয , ধ্যানধারণা ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠা পারিবারিক আইন নিজেকে ফৌজদারি আইন থেকে পৃথক করে নিয়ে নারীদের অধস্তন ও পুরুষ জাতিদের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। পারিবারিক আইন যুগপৎভাবেই পরিবারের প্রধান হচ্ছে পুরুষ ও উত্তরাধিকারীত্বও নির্ধারণ করা হয় পুরুষ ধারায়। সেখানে নারী কোনভাবেই সমান মর্যাদাবান নয়। রাষ্ট্রীয় আইনে ক্ষেত্রে একটি দুর্বল দিক হচ্ছে নারীর যে অবস্থানটি রাষ্ট্রীয় আইনের বিচারে আপাত স্বীকৃত সেটুকুই সমাজে অনুমিত নয়। রাষ্ট্রীয় আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্র চরিত্র বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে একটি পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ।
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, নারীর প্রতি সহিংসতার শেকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, নারীর অধস্তন অবস্থান প্রভৃতি নারীর প্রতি
সহিংসতার জন্ম দেয়। নারীর অধস্তনতা শুধু সম্পদে সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মধ্যদিয়েই তৈরি হয় না, সমাজে বিদ্যমান প্রথা, আচার, পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শের মাধ্যমেও এ অসমতা পাকাপোক্ত হয়। পরিশেষে বলা যায়, এদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীর প্রতি এ সহিংসতার অবসান ঘটাতে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পারিবারিক কাঠামো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বত্র নারীর পক্ষে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!