ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

নারীদের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব আলোচনা কর।

অথবা, নারীর উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব বর্ণনা কর।
অথবা, নারীদের উপর বিশ্বায়নের ফলাফল ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বিশ্বায়ন নারীর উপর কিরূপ প্রভাব বিস্তার করে তা বিস্তারিত তুলে ধর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বিশ্বায়ন বর্তমান সময়ের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রধান ধারী। তবে তা শুধু পুঁজিবাজারের সাথে সম্পর্কিত নয়; অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্র নির্মাণে বিশ্বায়নের ভূমিকা রয়েছে। তবে সকল নারীর উপর বিশ্বায়নের প্রভাব একই রকম নয়, সমাজ ও অঞ্চলভেদে পার্থক্য রয়েছে। উন্নত সমাজ ও শহরে বসবাসকারী নারীরা বিশ্বায়নের দ্বারা অধিক মাত্রায় প্রভাবিত হয়। অন্যদিকে অনুন্নত সমাজ ও গ্রামীণ নারীর উপর বিশ্বায়নের প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম। সাধারণভাবে সকল সমাজ ও অঞ্চলের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর উপর বিশ্বায়নের প্রভাব বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
নারীদের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব : নারীদের উপর বিশ্বায়নের দু’ধরনের প্রভাব রয়েছে। যথা : ইতিবাচক প্রভাব ও নেতিবাচক প্রভাব। নিম্নে এগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :
ইতিবাচক প্রভাব : ইতিবাচক প্রভাবগুলো ন ম্নরূপ :
১. নারীমুক্তি আন্দোলনের অভ্যুদয় ও বিকাশ : বিশ্বায়নের উদার মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গি নারীমুক্তি আন্দোলন অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দীর্ঘদিন যাবৎ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্বায়ন এক ধরনের মতাদর্শগত সমর্থন যুগিয়েছে। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মুক্তি আন্দোলনেও বিশ্বায়ন পরস্পর যুগপৎভাবে বিকশিত হয়েছে।
২. নারীর অধিকার ও মর্যাদা স্বীকৃতি : বিশ্বব্যাপী দীর্ঘদিন যাবৎ নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আলাদা আলাদাভাবে এ ধরনের সংগ্রাম হয়েছিল। কোথাও বা বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের সাথে নারীমুক্তি ও অধিকার বিষয়ক আন্দোলন একীভূত হয়ে চলছিল, আবার কোথাও কোথাও উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে একীভূতভাবে চলছিল ।
কিন্তু বিশ্বায়ন সারা বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার বিষয়ক এ আন্দোলনকে একীভূত করেছে এবং স্বীকৃতি আদায় করতে সাহায্য করেছে।
৩. আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন : বিশ্বায়নের ফলে নারীমুক্তি আন্দোলন আজ আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে নারী উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। নারীশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক সংগঠন, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। নারীমুক্তির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ।
৪. নতুন নতুন তত্ত্ব ও ধারণার উদ্ভব : বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের ফলে নানা তত্ত্বের উদ্ভব হচ্ছে। যেমন- গণতন্ত্র, সুশাসন, সাম্য, বৈষম্যহীণ, উদারতাবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ প্রভৃতি। এছাড়াও বিভিন্ন নারীবাদী তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে। যেমন- উদার নারীবাদ, মৌলিক নারীবাদ, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ, সাংস্কৃতিক নারীবাদ, পরিবেশনারীবাদ প্রভৃতি।
৫. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে : বিশ্বায়ন নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক দেশের পণ্য অন্য দেশে খুব সহজেই প্রবেশ করতে পারছে। ফলে মুনাফা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন বিনিয়োগ করছে, ভারি শিল্প কারখানা গড়ে তুলছে, ফলে
নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে।
৬. নারীর ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি : বিশ্বায়ন এর ইতিবাচক প্রভাবের ফলে সারা বিশ্বব্যাপী নারীর ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত শতকের মাঝামাঝি সময়ও নারীকে তার ভোটাধিকার আন্দোলন করতে হয়েছে। অথচ সারা বিশ্বব্যাপী আজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভোটাধিকার স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, নারী এখন রাজনীতিতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
৭. নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে : বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের ফলে সারা বিশ্বব্যাপী নারী শিক্ষার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেননা বিশ্বায়নের ফলে জেন্ডার ধারণার বিশ্বায়ন ঘটছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অপরাপর আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহ নারী শিক্ষার উপর অত্যধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব দাতা সংগঠনগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যে অর্থ সাহায্য দিচ্ছে তার পিছনে নারী উন্নয়নকে শর্তযুক্ত করে দেয়।
৮. স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি : বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব বিশ্বব্যাপী নারী স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মাতৃত্বজনিত, এইডস ও মহামারিতে নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হতো। বিশ্বায়নের সুফলে বিভিন্ন দেশীয় ও বিদেশি সংস্থা বিনামূল্যে নারীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছে।
খ. বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব : নারীর উপর বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব বেশি মারাত্মক। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো :
. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিভ্রান্ত নারী : বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াটি যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়েও বেশি সাংস্কৃতিক। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্বায়ন সারা বিশ্বব্যাপি এমন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরিতে সচেষ্ট। এর ফলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তৈরি হয়। বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ক্ষুদ্র জাতির সংস্কৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করে।
২. অভিবাসী শ্রমিক ও নারীর অধীর অপেক্ষা : বিশ্বায়নের ফলে উন্নত দেশগুলো ব্যাপক হারে শিল্পায়ন শুরু করে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় তারা সস্তা শ্রমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি তারা অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠে। ফলে তৃতীয় বিশ্ব থেকে প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক উন্নতদেশে গমন করে। নারী বছরের পর বছর স্বামীর অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে। এভাবে নারী প্রতিনিয়ত একধরনের হতাশার মাঝে থাকে, যা তার স্বাভাবিক জীবনে প্রভাব পড়ে।
৩. পতিতাবৃত্তির বিস্তার : বিশ্বায়ন রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করে সারা বিশ্বব্যাপী অবাধ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে ভ্রমণবিলাসী পর্যটকগণ সারা বিশ্বব্যাপী ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে করে পর্যটন ব্যবসায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এ ব্যবসাকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যে সারা বিশ্বব্যাপী পতিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪. পুরুষতন্ত্রের ভিত্তিকে দৃঢ় করে : বিশ্বায়ন হলো পুঁজিবাদের উপজাত। আর পুঁজিবাদ এর সাথে পুরুষতন্ত্রের সম্পর্ক নিবিড় । পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্র উভয় শোষণের মাধ্যমে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে চায়। পুরুষতন্ত্র নারীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে আর পুঁজিবাদ সমাজের বঞ্চিত শ্রেণিকে শোষণ করে। আর বিশ্বায়ন তাদের শোষণ প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

৫. পরিবেশ বিপর্যয় ও নারী : বিশ্বায়নের ফলে ব্যাপকভাবে আধুনিকায়ন হচ্ছে। যত্রতত্র, নগর গড়ে উঠছে, ব্যাপকভাবে শিল্পায়ন হচ্ছে। আর এর ফলে বায়ুমণ্ডলে CO2 এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, গাছপালা নির্বিচারে ধ্বংশ হয়ে যাওয়ায় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর এসব প্রতিকূল অবস্থায় নারী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৬. গণমাধ্যম ও নারী : বিশ্বায়নের একটি অন্যতম দিক হচ্ছে গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রসার ও ভূমিকা। বিশ্বায়নের ফলে ব্যাপকভাবে বাণিজ্য ও শিল্পায়ন হতে থাকে। আর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে তারা গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে থাকে। এক্ষেত্রে পণ্যের গুণাগুণ তুলে ধরার জন্য বিজ্ঞাপনে নারীকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে অশালীন ভঙ্গিতে উপস্থাপন করে, যা নারীকে পণ্যে পরিণত করে।
৭. হস্ত ও কুটির শিল্পায়ন : বিশ্বায়নের প্রভাবে শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পরিবর্তে বাজার দখল করে নিয়েছে শিল্পায়িত বিভিন্ন সামগ্রী। যা দামেও সস্তা। এতে করে নারী তার কর্মসংস্থান হারাচ্ছে এবং উৎপাদিত পণ্য হারাচ্ছে বাজার।
৮. কৃষিতে নারীর ভূমিকা হ্রাস : নারী কৃষিকাজের উদ্যোক্তা। সুপ্রাচীন কাল থেকেই নারীরা কৃষিকাজে ব্যাপক অবদান রেখে চলছে। বিশেষ করে বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, চারা উৎপাদন, ফসল মাড়াই, শস্য প্রক্রিয়া ধারণ, পশু পালন প্রভৃতি ক্ষেত্রে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের ফলে নারীর এসব ভূমিকা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলো সভ্যতার অগ্রযাত্রার স্বাক্ষর বহন করে। নারী মুক্তির লক্ষ্যে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, বিশ্বব্যাপী এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্বীকৃতি লাভ করেছে। অপরদিকে বিশ্বায়ন বাজার ব্যবস্থার উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করে। এই পুজিবাদের সাথে পুরুষতন্ত্র ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে বিশ্বায়ন নারীকে পণ্য হিসেবে গণ্য করছে। তবুও ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের দিকে লক্ষ্য রেখে বিশ্বায়নের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!