Answer

ধার্মিক আর কালচার্ড মানুষের মাঝে পার্থক্য কী? সংস্কৃতির সাথে মূল্যবোধের সম্পর্ক কী? ‘সংস্কৃতি কথা’ প্রবন্ধ অনুসরণে এসব প্রশ্নের উত্তর দাও।

অথবা, সংস্কৃতির সাথে মূল্যবোধের যে সম্পর্ক তা যুক্তিসহকারে আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর ‘সংস্কৃতি কথা’ প্রবন্ধে বিশদ আলোচনার মাধ্যমে ধর্ম ও কালচার, ধার্মিক ও কালচার্ড এবং সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ কি তা পৃথক পৃথকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নিম্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো :
ধর্ম : ধর্ম সাধারণ মানুষের কালচার। ধর্ম মানে জীবনের নিয়ন্ত্রণ। সাধারণ লোকেরা ধর্মের মাধ্যমেই উন্নত জীবন নির্দেশিকা পেয়ে থাকে। তাই তাদের কাছে ধর্ম ও কালচার এক। ধর্ম চায় মানুষকে পাপ থেকে, পতন থেকে রক্ষা করতে, মানুষকে বিকশিত করতে নয়। জীবনের গোলাপ ফোটানোর দিকে ধর্মের নজর নেই, জীবনটাকে নিষ্কণ্টক রাখাই তার উদ্দেশ্য। ধর্ম মানুষকে এ কারণে বিভিন্ন অনুশাসন দ্বারা শাসন করে। ধর্ম মানে জীবনের নিয়ন্ত্রণ। মার্জিত আলোক প্রাপ্তরা কালচারের মাধ্যমেই নিজেদের নিয়ন্ত্রিত করে- বাইরের আদেশে নয়। ভিতরের সূক্ষ্ম চেতনাই তাদের চালক; তাই তাদের জন্য ধর্ম ততটা দরকার হয় না। কিন্তু সাধারণ, ধার্মিক মানুষ ধর্ম ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না। জীবনের বিকাশকে বড় করে দেখে না বলে ধর্ম সাধারণত ইন্দ্রিয় সাধনার পরিপন্থী। অথচ ইন্দ্রিয়ের প্রদীপ জ্বেলে জীবনসাধনার অপর নাম সংস্কৃতি। ধর্মের মধ্যে আছে বৈরাগ্যের বীজ। কোন কোন ধর্ম নারীকে দেখেছে বিষের নজরে, আর কোন কোন ধর্ম ততটা না গেলেও সংগীত, নৃত্যের মাধ্যম ঘিরে যে ইন্দ্রজাল সৃষ্টি- তাতে জানিয়েছে ঘোর আপত্তি। সংগীত-নৃত্য ধর্মের কাছে কামেরই আয়োজন, কামের উন্নয়ন নয়।
কালচার : কালচার শিক্ষিত ও মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা; সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে ধারণা। সাহিত্য, শিল্প, সংগীত কালচারের উদ্দেশ্য নয়, উপায়। কালচারের উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে একটা ঈশ্বর বা আল্লাহ সৃষ্টি করা। কালচার সমাজতান্ত্রিক নয়, ব্যক্তিতান্ত্রিক। নিজেকে বাঁচাও, নিজেকে মহান কর, সুন্দর কর, বিচিত্র কর এ-ই কালচারের আদেশ। সত্যকে ভালোবাসা, সৌন্দর্যকে ভালোবাসা, ভালোবাসাকে ভালোবাসা, বিনা লাভের আশায় ভালোবাসা, নিজের ক্ষতি স্বীকার করে ভালোবাসা এরই নাম কালচার। সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা। প্রকৃতি ও সংসার এবং মানব ও সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা। কাব্য পাঠের মারফতে, ফুলের ফোটায়, নদীর ধাওয়ায়, চাঁদের চাওয়ায়, আকাশের নীলিমায়, তৃণগুল্মের শ্যামলিমায়, বিরহীর নয়ন জলে, মহতের জীবনদানে, গল্পকাহিনির মারফতে, নরনারীর বিচিত্র সুখদুঃখে, ভ্রমণকাহিনীর মারফতে, বিচিত্র দেশ ও জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে, ইতিহাসের মাধ্যমে, মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে, দুঃখীজনের দুঃখ নিবারণের অঙ্গীকারে বেঁচে থাকার নামই সংস্কৃতি।
ধার্মিক : ধার্মিক ব্যক্তি ধর্মের অনুশাসনে নিজেকে আবদ্ধ রেখে চোখ বুজে আল্লাহর সাধনা করে। আল্লাহকে সে স্মরণ করে ইহলোকে মজাসে জীবনযাপন করার জন্য আর পরকালে দোজখের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে। তার উদ্দেশ্য বেহেশতে একটি প্রথম শ্রেণির সীট রিজার্ভ করে রাখা। ইহকালে ও পরকালে সর্বত্রই একটা ইতর লোভ ধার্মিককে তাড়িত করে নিয়ে চলে।
কালচার্ড : অপরদিকে কালচার্ড লোকেরা ইহকাল ও পরকালের চিন্তা না করে তারা ভালোবাসে জীবনকে। তারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে অন্যায় আর নিষ্ঠুরতাকে। মানুষকে ন্যায়সঙ্গতভাবে শাস্তি দিতেও তাদের বুক কাঁপে। এরা নিজেদেরকে বিশেষভাবে গড়ে তোলে। নিজের চিন্তা, নিজের ভাবনা, নিজের কল্পনার বিকাশ না হলে কালচার্ড হওয়া যায় না। ধার্মিক চায় পাপ থেকে, পতন
থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে। আর কালচার্ড লোকেরা চায় জীবনের বিকাশ। তাদের কাজ জীবনে গোলাপ ফোটানো। এ কারণে ধার্মিক ও কালচার্ড মানুষের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে।
সংস্কৃতির সাথে মূল্যবোধের সম্পর্ক : সংস্কৃতি মানে জীবনের Values সম্পর্কে ধারণা। ধর্মের মত মতবাদ বা আদর্শও তা ধ্বংস করে দিতে পারে। মানুষ অমৃতের সন্তান। জীবনকে সঠিকভাবে পরিপূর্ণ করে তোলাই তার দায়িত্ব। জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলতে হলে অন্তরের মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত থাকতে হবে। মূল্যবোধহীন জীবনের চেয়ে অর্থহীন আর কিছুই নেই। অতীতে ধর্ম ঈশ্বরকে আচ্ছন্ন করেছিল, বর্তমানে মতবা মনুষ্যত্বকে আচ্ছন্ন করতে পারে। মনে রাখা দরকার ধর্মের দোষ মতবাদের ঘাড়ে এসে চেপেছে। মূল্যবোধের অভাবই এ সর্বনাশের কারণ। সৌভাগ্যের বিষয় সংস্কৃতিবানেরা মূল্যবোধে বিশ্বাস করে বলেই মতবাদের ধার ধারে না। তাদের কাজ বাইরে থেকে কোন দর্শন গ্রহণ না করে বহু বেদনায় নিজের ভিতর থেকে একটা জীবনদর্শনের জন্ম দেয়া। আর মূল্যবোধের দ্বারা জারিত করে দিন দিন তাকে উন্নতির দিকে চালিত করায় তারা পারঙ্গম।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পেক্ষিতে বলা যায় যে, ধর্ম ও কালচার এবং ধার্মিক ও কালচার্ড মানুষের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রায়ই এ দুটি ধারণা পরস্পর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। ধর্ম যেখানে মানুষকে ঘরের মধ্যে বন্দী করে রেখে সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে চায়, কালচার সেখানে মানুষকে কণ্টকাকীর্ণ জমিনে নিয়ে এসে সংগ্রাম করে বাঁচতে শেখায়। জীবনকে সুন্দর, মহৎ ও বিচিত্র করে গড়ে তুলতে কালচার মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগায়। ধর্ম ও কালচারের মূল পার্থক্য এখানেই।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!