জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্ক আলোচনা কর।

অথবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সম্পর্কযুক্ত? ব্যাখ্যা কর।
অথবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্ক কেমন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
জনসংখ্যা যে কোনো দেশের জন্যই এক মহামূল্যবান সম্পদ। উৎপাদনের যে চারটি উপকরণ ভূমি, মূলধন, শ্রমিক এবং সংগঠন রয়েছে তার তিনটিই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আসে জনসংখ্যা থেকে। ভূমিকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিক উৎপাদন করে আর এ প্রক্রিয়ায় সংগঠন মূলধন সংগ্রহ করে অন্যান্য উপকরণগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
সুতরাং, জনসংখ্যা আমাদের অমূল্য সম্পদ। তবে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা আবার সকল অশান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে জনসংখ্যার বিশালায়তনের কারণে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিঘ্নিত হচ্ছে তৈরি হচ্ছে নানান সামাজিক সমস্যা। তাই জনসংখ্যা আমাদের জাতীয় জীবনে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্ক : জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হলে যেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়, তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। নিম্নে এ দু’টি প্রত্যয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচনা করা হলো :
ক. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্ক : জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়ন গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। নিম্নে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো :
১. শিল্পায়ন : জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমবে। প্রত্যেক বছর আমাদের বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটাতে বিদেশ থেকে অনেক খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। জনসংখ্যা কমলে উক্ত ব্যয় কমিয়ে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে শিল্পায়নের গতিকে ত্বরান্বিত করা যায়।
২. বিনিয়োগ বৃদ্ধি : জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনসংখ্যা কমলে ভোগ ব্যয় কমবে ফলে সঞ্চয় বৃদ্ধি পেয়ে মূলধন গঠনে সাহায্য করবে। ফলশ্রুতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।
৩. জনকল্যাণমূলক ব্যয় হ্রাস : জনসংখ্যা হ্রাস পেলে জনকল্যাণমূলক ব্যয় হ্রাস পাবে এবং এ অর্থ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে।
৪. বেকারত্ব হ্রাস : বেকারত্ব অর্থনৈতিক উন্নতির পরিপন্থি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ফলে জনসংখ্যা কমলে বেকার সমস্যা কমবে, ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলবে।
৫. সামাজিক স্থিতিশীলতা : অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল সমাজ অপরিহার্য। অস্থিতিশীল সমাজে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ বিঘ্নিত হয়, ফলে উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলে, বেকারত্ব, দরিদ্রতা দূর হয়ে সমাজ স্থিতিশীল হয়। ফলশ্রুতিতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাহীনভাবে চলতে পারে।
৬. মানবসম্পদ উন্নয়ন : আধুনিক কল্যাণে অর্থনীতির মূল শ্লোগান হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন। মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধ্য। আর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন করা যায় ।
খ. অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক : অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দরিদ্রতা, বেকারত্ব কমলে জনসংখ্যাও কমে। নিম্নে এ দু’য়ের সম্পর্ক আলোচনা করা হলো :
১. জন্মহার : অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে জন্মহার হ্রাস, ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটে ফলে কুসংস্কার দূরীভূত হয়। সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের আগ্রহ বাড়ে। ফলে জন্মহার কমে।
২. বেকারত্ব, দরিদ্রতা হ্রাস : অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে বেকারত্ব, দরিদ্রতা হ্রাস পায়। আর দরিদ্রতা হ্রাস পেলে জন্মহার কমে, যেহেতু দরিদ্র লোকের প্রজনন ক্ষমতা বেশি।
৩. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন : অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটে। এতে মানুষ তার জীবন সম্বন্ধে অধিক সচেতন হয়ে উঠে, ফলে জন্মহার হ্রাস পায়।
৪. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় : দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পায়। মহিলা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। কর্মে নিয়োজিত নারী-পুরুষেরা অধিক সন্তান গ্রহণে আগ্রহী না হওয়ায় জন্মহার হ্রাস পায়, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হয়।
৫. চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি : অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়, ফলে চিত্তবিনোদনের অধিক ব্যয় করতে পারে। চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টির সাথে সাথে জন্মহার হ্রাস পায়, ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, জনসংখ্যা সম্পদ তবে তা সম্পদ এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার সাথে প্রাসঙ্গিক হতে হবে, নইলে এটা বোঝাতে পরিণত হবে। আমাদের জনসংখ্যা আজ এক বিশাল বোঝাতে পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোধ করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অবর্ণনীয় দুঃখের সম্মুখীন হতে হবে। তাই জনসংখ্যা রোধে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। যে কোনো মূল্যে এর ঊর্ধ্বগতিকে প্রতিরোধ করতে হবে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*