Answer

গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তরের কারণসমূহ উল্লেখ কর।১

অথবা, গ্রামের দরিদ্র মানুষ কেন শহরে স্থানান্তরিত হয়? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আলোচনা কর।
অথবা, গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তরের কারণসমূহ তুলে ধর।
অথবা, গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তরের কারণগুলো ব্যাখ্যা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
ইংরেজি ‘Migration’ এর বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে স্থানান্তর, স্থানান্তর গমন বা পরিমাণ। যিনি স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় পূর্বের এলাকা ছেড়ে নতুন স্থানে আবাস গড়েন, তিনি Migrant বা স্থানান্তরিত। সমাজ ও সময়ভেদে স্থানান্তর বাড়ে বা কমে। তবে গ্রামীণ দরিদ্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর দিন দিন বেড়ে চলেছে। মূলত আর্থিক দুর্গতির কারণেই গ্রামের মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে।

গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তর (Migration from village to town) : গ্রাম এলাকা ছেড়ে শহরে বা নগরে স্থানান্তর সাধারণত দুটি মৌলিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর একটি হচ্ছে Push Factor বা চাপ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, গ্রামীণ দারিদ্র্য, কাজের অভাব বা অন্যান্য আর্থিক ও সামাজিক সংকট গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে শহর বা নগরের দিকে ধাক্কা (push) বা চাপ দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে pull Factor বা আকর্ষণ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ,শহরের সুযোগ সুবিধা, বৈচিত্র্য ও চাকচিক্য যেন গ্রামের মানুষকে আকর্ষণ করছে বা টানছে। Push Factor এবং Pull Factor এ দুটি উপাদান বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্থানান্তরিত (Migrant) হয়ে থাকে। নিম্নে গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তরের কারণসমূহ আলোচনা করা হলো :
১. দারিদ্র্য বা আর্থিক সংকট (Poverty or economic crisis) : দেশের প্রায় ৮৫ ভাগ জনসংখ্যা গ্রামে বসবাস করেন, যাদের অধিকাংশেরই অর্থনৈতিক অবস্থান দারিদ্র্য বা দারিদ্র্যসীমার (Poverty line) নিচে। অধিক জনসংখ্যার চাপে গ্রামে তাদের মাথাপিছু জমির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। গ্রামের গরিব কৃষকদের স্বার্থে ভূমি ও কৃষি সংস্কার বাস্তবায়িত না হওয়ার ফলে দারিদ্র্য নামের কঠিন অনড় পাহাড় তাদের বেষ্টিত করে রাখছে। গ্রামের দরিদ্র লোকেরা দারিদ্র্যের ঘূর্ণাবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে সনাতন পদ্ধতিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর্থিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে তারা এক সময় শহরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অর্থাৎ, জীবিকা বা কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে।
২. পরিবহন ও যোগাযোগ (Transportation & communication) : বাংলাদেশের অনেক গ্রামের সাথে শহরের আদান-প্রদানকে সহজতর করার জন্য উন্নত রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, নৌ ব্যবস্থা প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে গ্রাম থেকে লোকজন সহজেই শহরে আসতে পারছে।
৩. শহরের বিচিত্র পেশা (Diverse occupation) : গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। গ্রামের তুলনায় শহরে অর্থনৈতিক লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, তথা মানুষের সাথে মানুষের আর্থিক সম্পর্কের মাত্রা ও বিস্তৃতি অনেক বেশি। তাই গ্রামের কর্মহীন, বেকার,গরিব মানুষ কাজ ও অর্থের অভাবে যখন একান্তই নিরূপায় হয়ে পড়ে, তখন কর্মসংস্থানের আশায় বাংলাদেশের ছোট বড় সকল শহরের দিকে তারা ধাবিত হয়।
৪. শিক্ষার সুযোগ (Opportunity for education) : গ্রামীণ সমাজে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা খুবই কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্জনের সুযোগ কম। গ্রামীণ ছেলেমেয়ে তাৎপর্যময়ভাবে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। শহরেই উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের গ্রামীণ সমাজের অনেক পিতামাতাই সন্তানদের সুশিক্ষিত বা
উচ্চশিক্ষিত করে তোলার জন্য শহরের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পাঠান। ফলে স্থানান্তর ঘটে থকে।
৫. উন্নততর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (Better health system) : গ্রামের দরিদ্র জনগণ বিভিন্ন কারণে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। পর্যাপ্ত খাদ্য ও পুষ্টির অভাবে তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থাও ভালো নয়। এছাড়া গ্রামে পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার ও নার্সের অভাব রয়েছে। হাসপাতালও তেমন গড়ে উঠেনি। আবার হাসপাতালে ডাক্তার অথবা নার্স থাকলেও ওষুধ সংকট এক বিরাট সমস্যা। দুরারোগ্য জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য গ্রাম থেকে রোগী এবং তার নিকট পরিজন শহরে আসেন। ফলে স্থানান্তরের সৃষ্টি হয় ।
৬. সামাজিক নিরাপত্তা (Social security) : গ্রাম্য রাজনীতির (Village politics) শিকার হয়ে অনেক সময় গ্রামের ধনী কৃষক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি নিরাপত্তার আশায় শহরমুখী হয়।
৭. নদীভাঙন (River erosion) : বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নদী ভাঙনের শিকার হয়ে গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে শহরের দিকে দলে দলে ছুটতে থাকে। তারা শহরের বস্তিতে, সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনের বাসায় থেকে জীবিকার উৎস খুঁজে থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণেও গ্রাম থেকে মানুষ নগর এলাকায় আসে।
৮. শহুরে সংস্কৃতি (Urban culture) : গ্রামের তুলনায় শহরের জীবন বিচিত্রময় ও চাকচিক্যপূর্ণ। শহরের অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান বা সংস্কৃতি, ফ্যাশান ইত্যাদি গ্রামের মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করে। পানি, বিদ্যুৎ, যানবাহন,
দ্রব্যসামগ্রী, নাটক, বিনোদন, উৎসব অনুষ্ঠান প্রভৃতি সুযোগ সুবিধা গ্রামীণ মানুষকে শহরের দিকে টানে। ফলে তারা গ্রামীণ আবাস ছেড়ে শহরে আসতে আগ্রহী হয়।
৯. মর্যাদা ও আভিজাত্য (Status & affluence) : গ্রামের কিছু লোক শহরে বসবাস করাকে উচ্চ মর্যাদা ও আভিজাত্যের লক্ষণ বলে মনে করেন। এরা তাই শখ করে হলেও গ্রাম ছেড়ে নগরে জীবন কাটাতে চলে আসেন। এছাড়া তারা শহরের এলিট শ্রেণি, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও শহুরে নামীদামিদের সমীহের খাতিরেও তারা শহরে আবাস গড়তে উৎসাহ দেখান।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, প্রত্যেক মানুষই যখন স্থানান্তর গমন করে, তখন তার মনে একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা বিরাজ করে। এটা কোন সহজ ব্যাপার নয় যে, একজন মানুষ তার আত্মীয় পরিজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে অন্যত্র গমন করে। স্থানান্তর সাধারণত অর্থনৈতিক বিষয়ের উপরই নির্ভর করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এখানে প্রতিনিয়তই জীবিকার প্রয়োজনে গ্রামীণ মানুষ শহরের দিকে ছুটে যায় । বাধ্যতামূলক বা প্রতিকূল অবস্থার প্রবল চাপেও গ্রামের লোকজন শহরে স্থানান্তরিত হয়।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!