Answer

ক্ষমতায়ন বলতে কি বুঝ? নারীর ক্ষমতায়নের পথে পরিদৃষ্ট সমস্যাসমূহ আলোচনা কর ।

অথবা, ক্ষমতায়ন বলতে কি বুঝ? নারীর ক্ষমতায়নের পথে বাধাসমূহ আলোকপাত কর।
অথবা, ক্ষমতায়ন কাকে বলে? নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ আলোকপাত কর।
অথবা, ক্ষমতায়ন কী? নারীর ক্ষমতায়নের সমস্যাগুলো বর্ণনা কর।
অথবা, ক্ষমতায়নের সংজ্ঞা দাও। নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায়গুলো আলোচনা কর।
উত্তর ভূমিকা :
সাম্প্রতিককালের উন্নয়ন ভাবনায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তথা বিত্তহীন জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি বেশ জোরেসোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সমতার ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের অধিকার মর্যাদার সমতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
উৎস : নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ ডিসেম্বর Syed Anwar Husain , “Empowerment may mean getting women into apex positions that oversee decision making affecting society and polity.” কিন্তু বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় নারীদের অবস্থা প্রান্তিক। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধারায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা কতিপয় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। আর নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে যেসব বন্ধকতা রয়েছে তা দূরীকরণের উপায়সমূহ আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।
ক্ষমতায়ন: ক্ষমতায়ন উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ৮০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে Empowerment শব্দটি একটি জনপ্রিয় পরিভাষা হয়ে উঠে এবং তা কল্যাণ, উন্নয়ন ও অংশগ্রহণ, দারিদ্র্য বিমোচনের মত শব্দগুলোর স্থলাভিষিক্ত হয়। সামাজিক অসমতা দূর করে নিপীড়িত বঞ্চিতদের অধস্তনতা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টাই হল Empowerment. অন্যকথায়, ক্ষমতায়ন বলতে তিন ধরনের সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণকে বুঝায়। যথা: বস্তুগত সম্পদ, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ এবং আদর্শিক সম্পদ। এ তিন ধরনের সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ক্ষমতায়ন।
নারীর ক্ষমতায়ন : সাধারণত উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নারীকে সরাসরি অংশগ্রহণ করানোর প্রক্রিয়াকে নারীর ক্ষমতায়ন বলা হয়। আবহমান কাল ধরে নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দু’টি দিক হল, প্রথমত, নারী ও পুরুষের মধ্যে ভিন্নতা। দ্বিতীয়ত, পুরুষের তুলনায় নারীর সীমিত অধিকার। এসব বৈষম্যের কারণে নারীরা আজ সামাজিক, অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিরাজমান সকল অসমতা ও বৈষম্য দূর করে নারীকে পুরুষের সমমর্যাদায় সমমানে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব তাকেই নারীর ক্ষমতায়ন বলা হয়। নারীর ক্ষমতায়নের পথে বাধাসমূহ বা প্রতিবন্ধকতাসমূহ : আলোচ্যবিষয়ে নারীদের কতিপয় সীমাবদ্ধতার কথা বলব যেগুলো প্রকারভেদে নারীর ক্ষমতায়নে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী বলে মনে হয়। নিম্নে সীমাবদ্ধতাসমূহ বা প্রতিবন্ধকতাসমূহ আলোকপাত করা হলো :
১. পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব : কিছু প্রগতিশীল ও অগ্রসর চিন্তার অধিকারী ব্যক্তি ছাড়া নারীদের প্রতি পুরুষদের এমনকি এক শ্রেণীর নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনও পরিবর্তন আসে নি। ফলে তা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে তাদের মনোভাব বা আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে এটাকে প্রতিবন্ধক বলা হয় এ কারণেই যে, এ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি মনোভাব বিদ্যমান থাকা মানে তাদের পক্ষ থেকে নারীর ক্ষমতায়নের পথে কোন না কোনভাবে বাধাগ্রস্ততা আসবেই যা নারী অধিকার কর্মীদেরকে মোকাবিলা করতে হয়। নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে অনেকেই প্রচণ্ড বিরোধিতা করে। আসলে এসব হচ্ছে, পুরুষতান্ত্রিক রুগ্ন মানসিকতার প্রকাশ।
২. মৌলবাদ : একটা বিষয় অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, মৌলবাদী শক্তিসমূহ সবসময় প্রগতিশীল চিন্তাচেতনা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা
৩. নারী স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়, যা সাম্প্রতিককালে বেশ বেড়েছে। মৌলবাদীরা কখনও কোন প্রগতিশীল পরিবর্তনকে মেনে নেয় না। আমাদের দেশে মূলত দু’ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম রয়েছে।
১. আধুনিক শিক্ষা,
মাদ্রাসা শিক্ষা ।
২,পরিণতিতে তিন ধরনের নাগরিকের বিকাশ ঘটেছে।
১. সংস্কারমনা আধুনিক মানুষ ।
গোঁড়ামিতে পরিপূর্ণ অন্ধবিশ্বাসী মানুষ ।
বিভ্রান্ত ও দোদুল্যমান মানুষ। নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে নারী অধিকারে বিশ্বাসী এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিয়োজিতদেরকে উপরিউক্ত ধরনের অবস্থাগুলো মনে রাখতে হবে। কারণ নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্নে দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্তদের কাছ থেকে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে। তৃতীয় শ্রেণিভুক্তদেরকে Neutral করা কষ্টসাধ্য হবে এবং প্রথমোক্তদেরকে সাথী হিসেবে পাওয়া যাবে।
৩. ভারসাম্যহীন ক্ষমতা কাঠামো : আমরা যদি আমাদের দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রসমূহের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব যে, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সরকার পর্যন্ত সর্বত্র পুরুষদের বিপুল সংখ্যাধিক্য। একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যদি ক্ষমতা কাঠামোতে পুরুষদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে সেখানে পুরুষালি মনোভাব কার্যকরী হওয়ার প্রবণতা থাকবেই, যা প্রকারান্তরে নারীর ক্ষমতায়নের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে।
৪. নিরাপত্তাহীনতা : নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিদ্যমান নারীর গতিশীলতা বিরোধী সংস্কৃতি ও বিদ্বেষমূলক ধারণার দাপট তো আছেই। তার সাথে আছে নারীর নিরাপত্তাহীনতা। নিরাপত্তা পাওয়া ও নারীর চলাফেরার অধিকার যদিও বা আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত অধিকার কিন্তু তা ব্যবহারের সুযোগ যে কত সংকুচিত তা
একমাত্র ভুক্তভোগীরাই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
৫. অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণহীনতা : আমাদের দেশের নারীরা অর্থনৈতিকভাবে একটা নির্ভরশীল সমাজ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আছে। আর নগদ অর্থ উপার্জন করতে না পারাটাই নির্ভরশীলতার মুখ্য কারণ। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থার অপরিহার্য পরিণাম হিসেবে মেয়েরা শুধু নগদ অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রসমূহে প্রবেশ করতে বাধা পায় তা নয়, যেখানে মেয়েরা নগদ অর্থ উপার্জন করে সেখানে পরিবারের পুরুষ প্রধানরাই তা নিয়ন্ত্রণ করে। এ অর্থ উপার্জনে বাধা কিংবা নিরুৎসাহিত করা এবং নিজ অর্জিত অর্থ নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার না পাওয়াটাই মেয়েদেরকে অধস্তন অবস্থায় ঠেলে দেওয়ার পিছনে একটা বড় কারণ। তাই নারীর ক্ষমতায়নের সংগ্রামে নারীদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণহীনতা যে অন্যতম প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
৬. সামাজিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা : এটা সবসময় মনে রাখতে হবে যে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীদেরকে শুধুমাত্র Reproductive role এ দেখতে অভ্যস্ত, Productive role এ নয়। নারীদের কোনরূপ সামাজিক অধিকার থাকতে পারে তা প্রচলিত সমাজ বুঝতে অক্ষম। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার কারণেও মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে এ ধারণার বশবর্তী হয়ে
পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি সাড়া দেয়। সেও চায় যে, তার আচরণগুলো পরিবারের ও সমাজের অন্যান্য সদস্য কর্তৃক সমর্থিত ও গ্রহণযোগ্য হোক। অথচ প্রত্যেক মেয়ের ভিতরে একজন আমি রয়েছে। আমিত্বের সন্ধানে যদি যেতে হয়, তাহলে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বুঝতে হবে। সুতরাং, নারীদের ক্ষমতায়নের সংগ্রামে তথাকথিত সামাজিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা যে একটা মস্তবড় প্রতিবন্ধকতা সেটা সংশ্লিষ্ট সকলকে বুঝতে হবে।
৭. বিদ্বেষমূলক প্রচারণা : নারীর অসুবিধার জন্য পিতৃতান্ত্রিক তথা পুরুষশাসিত সমাজই দায়ী। এ ক্ষোভ থেকেই অধিকার সংগ্রামী এক শ্রেণির নারী এমনভাবে পুরুষশ্রেণিকে দায়ী করে বক্তব্য দেন এবং প্রচার প্রচারণা চালান যাতে করে নারী অধিকার সংগ্রামীদের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক উদারপন্থি লোক আহত হয় ও ক্ষুব্ধ হয়, যা বস্তুত নারী অধিকার
প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক স্থিতি ও পারিবারিক শান্তি বিনাশের কোনরূপ চেষ্টা অবচেতন মনেও যদি কেউ করে থাকে, তাহলে তা নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রতিবন্ধক হিসেবেই কাজ করবে।
৮. এক পাক্ষিক উদ্যোগ : লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রায় সকল উদ্যোগ ও আয়োজন নারীরাই করছে। এখানে পুরুষদের সম্পৃক্ততা খুবই নগণ্য। পুরুষদের যেটুকু সংশ্লিষ্টতা আছে তা মূলত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অথচ নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে সমগ্র সমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ নারীসমাজকে উন্নয়ন ধারার বাইরে রেখে কোন জাতি কোনদিন কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। সুতরাং, নারীসমাজের যে কোন উন্নয়ন যে সামগ্রিক মানব উন্নয়নের পরিপূরক তা সকলকে বুঝতে হবে। আর তাই এক পাক্ষিক উদ্যোগকে নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধক মনে করা হয়।
৯. গণতন্ত্র ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের অভাব : মোটা দাগে দেখলে এটা প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে যে, নারীর ক্ষমতায়নের সাথে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সরাসরি সম্পর্ক নেই। আসলে কিন্তু বিষয়টা পুরোপুরি উল্টো। দেশীয় রাজনীতিতে যদি কোনরূপ অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা থাকে তাহলে শুধু পরিবেশ বিঘ্নিত হবে না, নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়নও বিলম্বিত হবে।
১০. নারী ইস্যুতে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা : পিতৃতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার পরিণাম হিসেবে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পুরুষদের হাতে একথা মেনে নিয়েও কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের বিষয়ে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে মানুষ আশার বীজ বপন করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রগতিশীলতার দাবিদার, গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী বলে প্রতীয়মান এবং সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত এসব রাজনৈতিক দলসমূহ নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উল্লেখ করার মত কার্যক্রম গ্রহণ করে না। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এসব দলকে কার্যকরভাবে কাছে পাওয়াটা খুবই জরুরি।
১১. সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা : আমরা নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বিভিন্ন মহলের সম্পৃক্ততার কথা যতই গুরুত্ব দিয়ে বলি না কেন, চূড়ান্ত গুরুত্ব কিন্তু নারীসমাজের নিজস্ব উদ্যোগ আয়োজনে। আসলে সবকিছু করতে হবে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায়। যৌথ প্রচেষ্টায় এবং নিয়মতান্ত্রিকতার মাধ্যমে রাজনৈতিক মত ও পথ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে
সর্বজনীনভাবে ন্যায্য ও কাঙ্ক্ষিত নারী অধিকারগুলো আদায়ে তেমন সরব ও সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে পারছে না। যা প্রকারান্তরে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এক প্রকার পরোক্ষ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
১২. নেতৃত্ব পর্যায়ে যথার্থ গতিশীলতার অভাব : নেতা হওয়া আর নেতৃত্ব দেওয়া কিন্তু এক জিনিস নয়। অনেক পথে নেতা হওয়া যায়। অথচ নেতৃত্বটা কিন্তু এমন নয়। এটা অর্জন করতে হয়, যার জন্য অনেক গুণাবলি থাকতে হয়, যেসব গুণাবলির শক্তিতে একটি সংগঠনকে সুচারুরূপে পরিচালনা করা যায়। আমাদের দেশের নারী নেতৃত্বের মধ্যে
যথাযথ গতির অভাব রয়েছে। যে কারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, আয়োজন ও কর্মতৎপরতা পরিচালনায় ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়, যা প্রকারান্তরে নারীর ক্ষমতায়নের পথকেই বাধাগ্রস্ত করে।
১৩. সুশীল সমাজের অনাসক্তি : আমাদের দেশে যাদেরকে সুশীল সমাজের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করি, যাদেরকে জাতির বিবেক বলতে আমরা পছন্দ করি, তাদের পক্ষ থেকে কখনও কখনও কিছু বিবৃতি, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালায় আমন্ত্রিত হয়ে কিছু জ্ঞানগর্ব বক্তৃতা ছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে কোন উদ্যোগ বা জোরালো ভূমিকা লক্ষ্য
করা যায় না। অথচ এটা তাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত বাসনা। সক্ষমতা, সামর্থ্যতা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন না করা এটাই নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বড় প্রতিবন্ধকতা।
১৪. প্রচলিত আইনের অধিকার ও সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭নং ধারা মতে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে বর্ণিত প্রথম উদ্দেশ্য ও সকল স্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামো ও ক্ষমতায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করা। তারপরও এটাকে পর্যাপ্ত ও যুগোপযোগী বলা যাবে না। প্রচলিত আইনসমূহের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেকগুলো আইন এখনও বর্তমান আছে যেগুলো নারীর সমানাধিকারের সাথে বিরোধপূর্ণ ও অসঙ্গতিপূর্ণ, যা নারীর ক্ষমতায়নের পথকে অবশ্য বাধাগ্রস্ত করছে।
১৫. নারীসমাজের অসচেতন ও শিক্ষার অভাব : আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার রেশ কম। এক্ষেত্রে নারীদের অবস্থা আরও খারাপ। ফলে নারীসমাজের মধ্যে অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অন্যান্য ধ্যানধারণা লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টা শুধু এ পর্যায়েই থেমে থাকে নি, শিক্ষাহীনতার কারণে দেশের বেশিরভাগ নারী বিশ্লেষণাত্মক
প্রক্রিয়ায় তাদের সমস্যা, সমস্যার কারণ ও উৎস এবং সমাধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে শুধু যথাযথভাবে ভাবতেই পারে না তা নয়, তারা তাদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বুঝতে খুব একটা সচেতন নয়। এ শিক্ষাহীনতা ও অসচেতনতাই নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অন্যতম প্রতিবন্ধক।
১৬. দারিদ্র্যতার অভিশাপ : পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোই যে নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রধান বাধা তাতে। দ্বিমত করার কিছু নেই। তবে এর সাথে নারীর ক্ষমতাহীনতার কারণ হিসেবে দারিদ্র্যতার দুষ্টজালের ভূমিকাও স্মরণ রাখা বোধ করি প্রয়োজন। সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে, দারিদ্র্যতার অভিশাপ নারী ও পুরুষ উভয়কে নির্যাতন তুলনামূলক বিচারে বেশি হয়। তাই বলা হয়, দারিদ্র্যতা বিত্তহীন নারীসমাজের ক্ষমতায়নের পথে অন্যতম সমানভাবে স্পর্শ করে। লক্ষ্য দেখা যাবে যে, দারিদ্র্য পরিবারগুলোতে নারীর জীবনে অশান্তি, নিপীড়ন, করলে বড় প্রতিবন্ধক।
১৭. চাকরি গ্রহণে অনীহা : ইদানীংকালের বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি ভালো ফল করছে। এতে মেয়েদের মেধা, মনন ও তৎপরতার অধিকতর কার্যকারিতা প্রমাণিত হচ্ছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, পাস করা মেয়েদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক মেয়েই চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হচ্ছে। এতে দেশ ও জাতি তাদের থেকে প্রাপ্য ভূমিকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিতই হচ্ছে, নারীর ক্ষমতায়নের গতিও শ্লথ হচ্ছে।
১৮. আত্মসমালোচনায় অনীহা : নারীদের মধ্যেও যে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা আছে, দায়িত্ব গ্রহণ ও পালনে অনাগ্রহ ও অনীহা আছে, হীনম্মন্যতাবোধ আছে, স্ববিরোধিতা আছে, আবেগের আতিশয্যে নিজেকে সমর্পিত করার অভ্যাস আছে, প্রয়োজনীয় তৎপরতার ঘাটতি আছে, কুশলি ভূমিকা পালনে অপারগতা আছে ইত্যাদি বিষয়গুলোতে আত্মসমালোচনামূলক মনোভাব প্রদর্শন ও বক্তব্য প্রদানে নারীরা খুব একটা উদার বলে মনে হয় না। আত্মশুদ্ধির জন্য গঠনমূলক প্রক্রিয়ায় আত্মসমালোচনা করা কিন্তু কোন দোষের বিষয় নয়। তাই বলা যায় যে, আত্মসমালোচনায় অনীহা নারীর ক্ষমতায়নের পথে একটি প্রতিবন্ধক।
১৯. পণ্যরূপে গণ্য হতে সহায়কের ভূমিকা : চলচ্চিত্রে এবং বিজ্ঞাপনে যখন একজন নারী যৌন আবেদনময়ীরূপে নিজেকে উপস্থাপিত করেন তা খুবই স্থূল মানসিকতার পর্যায়ে পড়ে। তাহলে এহেন অর্থনৈতিক ও অনুচিত কর্ম করে এক শ্রেণির নারী নিজেদেরকে পণ্যরূপে গণ্য হতে সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। তাদের এহেন আচরণ সমগ্র নারীসমাজ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টিতেও অবদান রাখছে, যা নারীর ক্ষমতায়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে।
২০. অন্যান্য : আর খোঁড়াখুঁড়ি খোঁজাখুঁজি করলে আরও কিছু দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতার কথা হয়তোবা জানা যাবে। তবে নারীর ক্ষমতায়নের মূল সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা গেছে বলে মনে হয়। তাছাড়া আরও কিছু ছোটখাট সমস্যা চোখে পড়ে সেগুলোকে সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি। যেমন-উগ্র সাজপোশাক, যেগুলো এদেশের ধর্মভীরু মানুষকে আহত করে। এছাড়া সামাজিক মূল্যবোধগুলোর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অন্যান্যের সমর্থনে এগিয়ে না আসা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ইত্যাদিও রয়েছে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার শেষে বলা যায় যে, বাঙালি নারীসমাজ যে অবরোধ যুগ থেকে জাগরণের যুগ বেয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার যুগে প্রবেশ করেছে এ কথাটা যেমনি সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য নারীরা আজও পুরুষদের অধস্তন পর্যায়ে আছে। এখনও সর্বত্র পুরুষের নিয়ন্ত্রণ বর্তমান। নারীরা আজও নির্যাতিতা ও নিরাপত্তাহীন। এ দু’সত্যের মাঝামাঝি কথাটি হল নারীর ক্ষমতায়নের অভিযাত্রায় বন্ধন শিথিল হয়েছে বটে, কিন্তু টুটে যায় নি আদৌ। পরিশেষে, আবারও বলি নারী ক্ষমতায়নের জন্য মূলত পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, কাঠামো এবং দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবই প্রধানত দায়ী |

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!