ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

অন্নপূর্ণা এক সর্বংসহা শাশ্বত জননীর প্রতিমূর্তি”- উক্তিটির আলোকে অন্নপূর্ণার মাতৃহৃদয়ের পরিচয় দাও।

অথবা, “বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুঁইমাচা’ সন্তানবাৎসল্যের একখানা প্রামাণ্য দলিল” উক্তিটির যথার্থতা যাচাই কর।
অথবা, ‘পুঁইমাচা’ গল্পে সহায়হরি চাটুয্যে ও অন্নপূর্ণার মধ্যে সন্তানবাৎসল্যের যে প্রাবল্য দেখা যায় তার বিবরণ দাও। জীবন বিশ্লেষণ, প্রকৃতি বর্ণনা ও সহানুভূতিপূর্ণ স্নিগ্ধ করুণরসের শিল্পশুদ্ধ বর্ণনায় তাঁর সৃষ্টি সম্ভার পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে।
উত্তর৷ ভূমিকা :
শরৎ পরবর্তী বাংলা কথা সাহিত্যে স্বাতন্ত্র্য ও শ্রেষ্ঠত্বে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এক অবিস্মরণীয় নাম। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত ‘পুঁইমাচা’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প। এই গল্পে গল্পকার নিম্নবিত্ত বাঙালির অনটনক্লিষ্ট পারিবারিক জীবনের বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন। সহায়হরি চাটুয্যের সংসার জীবনকে তুলে ধরতে গিয়ে বিভূতিভূষণ সহায়হরি ও তাঁর স্ত্রী অন্নপূর্ণার সন্তান-বাৎসল্যের প্রাবল্যকে মর্মস্পর্শী করে তুলেছেন। দারিদ্র্যপীড়িত একটি ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যা বিয়োগের ঘটনা গল্পটিকে করুণরসে সিক্ত করেছে। সন্তান-বাৎসল্যই এই গল্পের মূল উপজীব্য।
সন্তান-বাৎসল্যের সংজ্ঞা : সন্তানের প্রতি মা বাবার যে অতুলনীয় মায়া, মমতা,স্নেহ, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা প্রতিনিয়ত পল্লবিত হয় তাকে সন্তান-বাৎসল্য বলা হয়ে থাকে। ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ছাড়া প্রত্যেক মা-বাবার মধ্যে সন্তান-বাৎসল্যের এই প্রবণতাটি ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত ‘পুইমাচা’ গল্পের গৃহকর্তা সহায়হরি চাটুয্যে এবং গৃহিণী অন্নপূর্ণার মধ্যে যে সন্তান-বাৎসল্য প্রত্যক্ষ করা যায় তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য উপকরণ।
অন্নপূর্ণার সন্তান-বাৎসল্য : সহায়হরি চাটুয্যের স্ত্রী অন্নপূর্ণা একজন সহজ, সরল, মমতাময়ী মা। স্বামীর অভাব-অনটন জর্জরিত সংসারটিকে এ মহীয়সী রমণী বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। ভগবান তাঁকে পরীক্ষা করার জন্যই হয়তো চার চারটি মেয়ের মা করেছেন। মেয়েগুলোকে তিনি ঠিকমতো পরিচর্যা করতে না পারলেও তাদের প্রতি তাঁর মায়া-মমতার অন্ত ছিল না। অন্নপূর্ণা কন্যাদেরকে একদিকে যেমন শাসনে রেখেছেন অন্যদিকে তেমনি আদর যত্নও করেছেন। জ্যেষ্ঠ কন্যা ক্ষেন্তির ভোজনপটুতাকে করেন নি। বরঞ্চ সহজ সরল এই মেয়েটিকে তিনি সর্বদা প্রশ্রয়ের চোখে দেখেছেন। ক্ষেন্তির প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল অপরিমেয়। মেয়েদেরকে অন্নপূর্ণা ভালো কিছু খাওয়াতে না পারলেও নারকেল কোরা, নারকেলের পিঠা, ময়দার গোলা, পুঁইশাকের চচ্চড়ি প্রভৃতি খেতে দিতে কার্পণ্য করেন নি। ক্ষেন্তির অকালমৃত্যুর পর তিনি পাথরে বুক বেঁধেছেন। ক্ষেন্তির অবর্তমানে অন্নপূর্ণা অবশিষ্ট মেয়েদের পরিচর্যার কাজে অবহেলা দেখান নি। সন্তান-বাৎসল্যের প্রাবল্য তাঁকে মহীয়সী রমণীতে পরিণত করেছে।
সহায়হরির সন্তান-বাৎসল্য : হতভাগ্য সহায়হরি চাটুয্যে এক দরিদ্র বাহ্মণ। তিনি পুত্রহীন, চার কন্যার জনক। কিন্তু মেয়েদেরকে সহায়হরি পুত্রের অধিকস্নেহ করতেন। তিনি মেয়েদেরকে একটু আধটু ভালো খাওয়ানোর জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে কিংবা চুরি করতেও দ্বিধা করেননি। কন্যাদের জন্য তিনি তারক খুড়োর কাছ থেকে রস চেয়ে আনতে গিয়েছেন। বরজপোতার জঙ্গল থেকে বিশালাকৃতির মেটে আলু তুলে এনেছেন। বড় মেয়ে ক্ষেন্তির বিয়ের আশীর্বাদ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি পাত্রের অসচ্চরিত্রতার সংবাদ পেয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন। এভাবে সহায়হরির প্রতিটি আচার-আচরণে সন্তান-বাৎসল্যের প্রাবল্য ফুটে উঠেছে।
অপত্য স্নেহের প্রাবল্য : অপত্যস্নেহ হচ্ছে সন্তান-বাৎসল্যের অন্যতম প্রধান উপাদান। এইস্নেহের কারণে মা-বাবা অন্ধের মত নিজ সন্তানকে ভালোবাসে। যে মা- বাবার মধ্যে এ অপত্য স্নেহ নেই তারা হয় পাগল না হয় বোধশক্তিহীন। ‘পুঁইমাচা’ গল্পের মা-বাবা সহায়হরি ও অন্নপূর্ণার মধ্যে অপত্য স্নেহের প্রাবল্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এরা আপন সন্তানদের পরিচর্যা ও মঙ্গল কামনায় সাধ্যমতো সক্রিয় ছিলেন। লোকলজ্জা, সমাজের অনুশাসন, পারিবারিক অভাব-অনটন কোনকিছুই তাদের অপত্যস্নেহে৷ ভাঙন ধরাতে পারেনি। তারা সর্বংসহা ধরণীর মতো আপন সন্তানদের বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন।
শাশ্বত জননী অন্নপূর্ণা : অন্নপূর্ণা গ্রামবাংলার সর্বংসহা এক শাশ্বত জননী প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে অন্নপূর্ণার মতো
ধৈর্যশীল জননীরা বাংলাদেশের পরিবারগুলোকে বুকের ভালোবাসা দিয়ে লালন করে আসছেন। এঁদের কারণেই গ্রামে গ্রামে হাজার হাজার সুখী পরিবার গড়ে উঠেছে। এঁরা নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে পরিবার পরিজনকে সুখী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে আসছেন। অন্নপূর্ণা আপন আচার-আচরণে প্রমাণ করেছেন যে তিনি এদেরই একজন।
সন্তান-বাৎসল্যের প্রামাণ্য দলিল : সন্তান-বাৎসল্য মানব-মানবীর চিরন্তন আবেগ অনুভূতির শিল্পীত বহি:প্রকাশ। মানুষের অন্তরের মধ্যে ফল্গুধারার মত এই বাৎসল্য রস সৃষ্টির আদি যুগ থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুঁইমাচা’ গল্পে এর প্রাধান্য অত্যধিক। গল্পটিতে এক অসহায় দরিদ্র ব্রাহ্মণ দম্পত্তির হৃদয়ের রক্তক্ষরণ তাঁদেরকে মহান পিতা-মাতায় পরিণত করেছে। এদের ক্ষমতা ও সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও এরা আপন সন্তানদের গায়ে কাঁটার আঁচড় লাগতে দেননি। বিয়ের যোগ্য কন্যাকে উপযুক্ত পাত্রের হাতে সমর্পণ করার জন্য এরা যথাসাধ্য মনোযোগী ছিলেন। সন্তানদের শাসন করার পাশাপাশি সোহাগ করতে ভোলেননি কখনো। দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, সামর্থ্যহীনতা এদেরকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করলেও সহায়হরি ও অন্নপূর্ণা আপন আপন কর্তব্যে অনড় থেকেছেন। তাদের সন্তানদের প্রতি অপরিমেয় ভালোবাসার কারণেই বলা যায়, ‘পুইমাচা’ সন্তান বাৎসল্যের এক প্রামাণ্য দলিল।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সন্তান-বাৎসল্য জনক জননীর একান্তই নিজস্ব সম্পদ। প্রত্যেক মা- বাবাই আপন অন্তরের মধ্যে সযত্নে একে পরিচর্যা করে থাকেন। সন্তান-বাৎসল্য পিতা-মাতার ক্ষেত্রে একটি চিরন্তন সত্য। একে বাদ দিয়ে পিতা-মাতা হওয়া যায় না। ‘পুঁইমাচা’ গল্পের সহায়হরি চাটুয্যে ও অন্নপূর্ণার মধ্যে এই সন্তান-বাৎসল্য দেখে পাঠক অভিভূত হন।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!